

যশোর প্রতিনিধি :
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যশোরের রাজনীতিতে বড় ধরনের সমীকরণ পরিবর্তনের আভাস মিলছে। বিএনপির প্রার্থী তালিকায় শেষ মুহূর্তের রদবদল, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও তৃণমূল পর্যায়ের অসন্তোষের সুযোগ কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি মাঠে তুলনামূলকভাবে একক আধিপত্য বিস্তার করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শরিক দলগুলোর দিক থেকে বড় কোনো চাপ না থাকায় যশোরে জামায়াত এখন অনেকটাই নির্ভার অবস্থানে রয়েছে।
নির্বাচনি তৎপরতা শুরুর অনেক আগেই যশোরের ছয়টি সংসদীয় আসনে নিজেদের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করে মাঠে শক্ত অবস্থানের জানান দেয় জামায়াতে ইসলামী। বছরের শুরু থেকেই দলটির প্রার্থীরা তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ এবং সাধারণ মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থেকে সাংগঠনিক ভিত্তি আরও মজবুত করেছেন।
যশোর জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি অধ্যাপক গোলাম কুদ্দুস বলেন,
“আমরা আটদলীয় জোটের অংশ হয়েই নির্বাচন করছি। জোটের স্বার্থে প্রয়োজন হলে ছাড় দিতে প্রস্তুত আছি। তবে আমাদের প্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে থাকায় সাংগঠনিকভাবে আমরা বেশ এগিয়ে আছি।”
অন্যদিকে যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে চারটিতে শেষ মুহূর্তে প্রার্থী পরিবর্তন করেছে বিএনপি, যা নির্বাচনি সমীকরণকে জামায়াতের দিকে হেলিয়ে দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
যশোর-১ (শার্শা) আসনে মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে বাদ দিয়ে শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনকে মনোনয়ন দেওয়ায় তৃণমূলের একটি অংশ হতাশ। এই আসনে জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আজীজুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় ও জনপ্রিয় হিসেবে পরিচিত।
যশোর-৪ (বাঘারপাড়া–অভয়নগর ও বসুন্দিয়া ইউনিয়ন) আসনে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পাওয়া কেন্দ্রীয় নেতা ইঞ্জিনিয়ার টিএস আইয়ূব শেষ পর্যন্ত বাদ পড়েন। চূড়ান্তভাবে মনোনয়ন দেওয়া হয় অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার রহমান ফারাজীকে, যা দলীয় কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে।
যশোর-৫ (মণিরামপুর) আসনে শক্তিশালী প্রার্থী শহীদ মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনকে বাদ দিয়ে জোটের শরিক জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি রশীদ বিন ওয়াক্কাসকে মনোনয়ন দেওয়ায় বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে বিক্ষোভ দেখা দেয়। এতে এই আসনে বিএনপির ভোটব্যাংক বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যশোর-৬ (কেশবপুর) আসনে কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণের পরিবর্তে আবুল হোসেন আজাদকে মনোনয়ন দেওয়ায় দুই গ্রুপের মধ্যে দূরত্ব বেড়েছে। এ আসনে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক মোক্তার হোসেন স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও জনপ্রিয় মুখ হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন।
বিএনপির ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের মতে, এসব অদলবদল কার্যত জামায়াতের প্রার্থীদের জয়কে সহজ করে দিচ্ছে।
এদিকে জামায়াতসহ আটদলীয় জোটের শরিকদের মধ্যে আসন সমঝোতা নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক চলছে। জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা সবকটি আসনে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করলেও শেষ পর্যন্ত ‘জয়ী হওয়ার সক্ষমতা’ বা উইনেবিলিটিকেই প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় নেতা মাওলানা শোয়াইব হোসেন এবং খেলাফত মজলিসের মাওলানা বেলায়েত হোসেন জানান, তারা জোটগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। তবে তাদের মতে, যশোরে জামায়াতের প্রার্থীরা অন্যান্য শরিকদের তুলনায় সাংগঠনিক ও প্রচারণার দিক থেকে অনেক বেশি গোছানো।
জরিপ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, যশোরে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, প্রার্থী পরিবর্তন এবং সংখ্যালঘু ভোট নিয়ে শঙ্কার কারণে মণিরামপুর ও শার্শার মতো আসনগুলোতে জামায়াত আরও সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করেছে।
সব মিলিয়ে, শরিকদের চাপ থাকা সত্ত্বেও যশোরে জামায়াতের প্রার্থীরা এখন পর্যন্ত অন্য সব দলের তুলনায় বেশি সংগঠিত ও আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছেন। আগামী দুই–তিন দিনের মধ্যে জোটের চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ হলে যশোরের নির্বাচনি লড়াইয়ের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
