
নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ১৪ আগস্ট — দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক, যুগোপযোগী ও নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে পুনর্গঠনের জন্য ৩০ দফা প্রস্তাবনা দিয়েছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের আব্দুস সালাম হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি জাহিদুল ইসলাম লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা “ফ্যাসিবাদের উদর থেকে জন্ম নেওয়া” এবং এটি শিক্ষার্থীদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে ব্যর্থ। তার মতে, নতুন প্রজন্মকে শুধু প্রযুক্তি-দক্ষ করলেই চলবে না; বরং নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক মূল্যবোধের সমন্বয় জরুরি।
“শিক্ষা ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার দরকার”
সংবাদ সম্মেলনে জাহিদুল ইসলাম বলেন—
“আমরা এমন একটি শিক্ষা কাঠামো চাই যা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ, কিন্তু একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধে পরিপূর্ণ। শিক্ষার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত একজন মানুষকে সৎ, দক্ষ ও সমাজের জন্য উপযোগী করে গড়ে তোলা।”
তিনি আরও যোগ করেন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন শিক্ষা কমিশন গঠন ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়।
প্রস্তাবনার বিস্তৃত বিবরণ
সংগঠনটির প্রস্তাবনায় পাঁচটি প্রধান খাতকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে—
- শিক্ষানীতি ও পাঠ্যক্রম সংস্কার
- শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসন
- শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন
- গবেষণা, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা
- সমতা, অন্তর্ভুক্তি ও নৈতিক মূল্যবোধ
প্রতিটি প্রস্তাবনার সঙ্গে সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হলো—
১. অন্তর্ভূক্তিমূলক শিক্ষা কমিশন গঠন
সব রাজনৈতিক দল, শিক্ষক, শিক্ষাবিদ, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে একটি স্বাধীন কমিশন, যা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন তদারকি করবে।
২. জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্তকরণ
১৯৯০-এর জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস শিক্ষার্থীদের গণতান্ত্রিক চেতনা জাগাতে পাঠ্যক্রমে সংযোজন।
৩. ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সমন্বয়ে আধুনিক শিক্ষাক্রম
আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা একত্রিত করে পাঠ্যক্রম তৈরি।
৪. বহুমাত্রিক মূল্যবোধের বিকাশ
সহমর্মিতা, সহনশীলতা, দেশপ্রেম, সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তোলার জন্য আলাদা কর্মসূচি।
৫. STEM শিক্ষায় অগ্রাধিকার
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষায় বেশি বাজেট, প্রশিক্ষক ও অবকাঠামো নিশ্চিত।
৬. ভাষা শিক্ষায় উন্নয়ন
বাংলা, ইংরেজি ও আন্তর্জাতিক তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ বৃদ্ধি, যাতে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করা যায়।
৭. সামরিক ও শারীরিক শিক্ষা
শৃঙ্খলা, আত্মরক্ষা ও শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ।
৮. শিক্ষা বাজেটে অগ্রাধিকার
জাতীয় বাজেটের অন্তত ২০% শিক্ষা খাতে বরাদ্দের দাবি।
৯. আনন্দমুখর প্রাথমিক শিক্ষা
শিশুদের জন্য খেলাধুলা, সৃজনশীল কার্যক্রম ও মানসিক চাপহীন শিক্ষাব্যবস্থা।
১০. উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক শিক্ষা
আইন করে বিনামূল্যে শিক্ষা ও প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহ।
১১. স্বাধীন নিয়োগ কমিশন
রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়া।
১২. নারী শিক্ষার প্রসার
নারী শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, স্কলারশিপ, ও পরিবহন সুবিধা।
১৩. শিক্ষা আইন প্রণয়ন
একটি পূর্ণাঙ্গ শিক্ষা আইন করে তার কার্যকর বাস্তবায়ন।
১৪. শতভাগ আবাসন
সকল পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ ও সাশ্রয়ী হোস্টেল।
১৫. মানসিক স্বাস্থ্যসেবা
প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কাউন্সেলিং সেন্টার ও সাইকোলজিস্ট নিয়োগ।
১৬. শিক্ষার্থী বান্ধব শিক্ষাঙ্গন
সহিংসতামুক্ত, মুক্তচিন্তা ও সহযোগিতামূলক পরিবেশ।
১৭. যোগ্য বোর্ড সদস্য
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে অভিজ্ঞ শিক্ষাবিদদের অগ্রাধিকার।
১৮. গবেষণামুখী উচ্চশিক্ষা
বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা তহবিল, ল্যাব ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি।
১৯. মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন
ধর্মীয় পাঠক্রমে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা যুক্ত করা।
২০. কারিগরি শিক্ষার মানোন্নয়ন
শিল্প-প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা উন্নয়ন।
২১. মূল্যায়ন পদ্ধতির সংস্কার
মুখস্থনির্ভর পরীক্ষার পরিবর্তে বিশ্লেষণী ও প্রকল্পভিত্তিক মূল্যায়ন।
২২. শিক্ষক প্রশিক্ষণের আধুনিকায়ন
ডিজিটাল শিক্ষা, ই-লার্নিং ও আপডেটেড কারিকুলাম।
২৩. শিক্ষক মূল্যায়ন
শিক্ষার্থীর মতামত ও শিক্ষকের কর্মদক্ষতার ওপর ভিত্তি করে মূল্যায়ন।
২৪. চাকরিতে সমান সুযোগ
যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ, বৈষম্যমুক্ত নীতি।
২৫. ছাত্ররাজনীতির যথাযথ চর্চা
সহিংসতামুক্ত রাজনীতি ও নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন।
২৬. বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীর অন্তর্ভুক্তি
প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য র্যাম্প, ব্রেইল বই, বিশেষ প্রশিক্ষক।
২৭. পথশিশুদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তি
বিনামূল্যে শিক্ষা, পুনর্বাসন ও স্বাস্থ্যসেবা।
২৮. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি
চেতনা নিউজ ২৪, [8/15/2025 12:03 AM]
প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি।
২৯. উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর শিক্ষা
মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা ও সমান সুযোগ।
৩০. অভিভাবক অংশগ্রহণ
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অভিভাবকের সক্রিয় ভূমিকা ও জবাবদিহিতা।
পটভূমি
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাজেট স্বল্পতা, অবকাঠামোগত সমস্যা, রাজনৈতিক প্রভাব এবং গবেষণার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আন্তর্জাতিক মানে টিকে থাকতে হলে শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতা নয়, সামাজিক ও নৈতিক শিক্ষা সমানভাবে জরুরি—এমনটাই মনে করে ছাত্রশিবির।
প্রতিক্রিয়া
শিক্ষাবিদদের কেউ কেউ প্রস্তাবনাকে স্বাগত জানিয়েছেন, তবে বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন—
“অনেক প্রস্তাবই ভালো, কিন্তু এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, পর্যাপ্ত বাজেট ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার।”
উপসংহার
ছাত্রশিবিরের এই প্রস্তাবনা শিক্ষা সংস্কারের আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তবে তা বাস্তবায়ন নির্ভর করছে সরকারের পদক্ষেপ, অর্থায়ন ও সামাজিক সমর্থনের ওপর।


