
কায়েমকোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন: ১৬ বছরেও মেলেনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ন্যায্য অধিকার
ঝিকরগাছা (যশোর) প্রতিনিধি:
যশোরের ঝিকরগাছা উপজেলার ২ নম্বর মাগুরা ইউনিয়নের কায়েমকোলা গ্রামের ঐতিহ্যবাহী কায়েমকোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় গত প্রায় দুই দশক ধরে একের পর এক অনিয়ম, কর্তৃত্ববাদ ও রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগে জর্জরিত। ১৯৬৫ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয় একসময় শিক্ষার আলোকবর্তিকা হলেও, এখন দুর্নীতি, পক্ষপাত ও প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলার জন্য সমালোচিত।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৯ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিদ্যালয়ের বিভিন্ন ম্যানেজিং কমিটি ও এডহক কমিটি কর্তৃপক্ষের কাছে বিএনপি পরিবারের সদস্যদের ন্যায্য দাবি-দাওয়াগুলো ধারাবাহিকভাবে উপেক্ষিত হয়েছে। এসব কমিটি পরিচালিত হয়েছে আওয়ামীপন্থী প্রভাববলয় ও দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক মোঃ আহসান উল্লাহর একক কর্তৃত্বে।
মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ১৬ বছরের বঞ্চনা
বিদ্যালয়ের প্রাক্তন দপ্তরি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মৃত আ. মান্নান গোলদার ২০০৯ সালের ১৩ জুলাই কর্মরত অবস্থায় মারা যান। কিন্তু তার অবসর ও কল্যাণভাতা সংক্রান্ত ফাইল ২০১১, ২০১৩ ও ২০১৬ সালে টানা তিনবার ভুল তথ্য দিয়ে ঢাকায় পাঠানো হয়। ফলে পরিবারের সদস্যরা বারবার প্রক্রিয়াগত জটিলতায় পড়েছেন, কিন্তু এক টাকাও পাননি।
প্রয়াত দপ্তরির সন্তান অভিযোগ করে বলেন,
“প্রতিবার কাগজপত্র ঠিক করে পাঠানো হলেও ঢাকায় গিয়ে দেখি কিছু না কিছু ভুল ধরিয়ে দিয়েছে। ১৬ বছর ধরে ঘুরছি, সবাই প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কিছুই হয়নি।
”তিনি আরও জানান, সর্বশেষ ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নতুনভাবে ফাইল পাঠানো হয়েছে, কিন্তু সেটিও এখনো “পেন্ডিং” অবস্থায় আছে।
দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষক
বিদ্যালয়ের দীর্ঘদিনের প্রধান শিক্ষক মোঃ আহসান উল্লাহর বিরুদ্ধে ব্যাপক দুর্নীতি, দলীয়করণ এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। তিনি গত ২২–২৪ বছর ধরে দায়িত্ব পালন করছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, তিনি আওয়ামী লীগের স্থানীয় রাজনীতির ছায়ায় থেকে প্রতিষ্ঠানটি নিজের দখলে রেখেছেন।
সবশেষ অভিযোগ অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে আহসান উল্লাহ ছলচাতুরীর মাধ্যমে একটানা চার মাসের ছুটি নিয়েছেন, যদিও তার শেষ কর্মদিবস ছিল ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫। বর্তমান ছয় মাস মেয়াদী এডহক কমিটি (মেয়াদ ৩০ নভেম্বর ২০২৫) তাকে চাকরির শেষ দিন পর্যন্ত ছুটি মঞ্জুর করে, যা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মধ্যে।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের নির্লিপ্ত ভূমিকা
বর্তমানে দায়িত্বে থাকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ আলী কদর টিএনও কার্যালয়ে লিখিতভাবে জানিয়েছেন যে বিদ্যালয়ে “কোনো সমস্যা নেই”। কিন্তু স্থানীয় অভিভাবক ও ভুক্তভোগীরা বলছেন,
“বিদ্যালয়ে সব সমস্যা চেপে রাখা হচ্ছে। ফাইল আটকে আছে, দুর্নীতি চলছে, অথচ কর্তৃপক্ষ বলছে সব ঠিক আছে—এটা হাস্যকর।”
কমিটি গঠনে গণতন্ত্রহীনতা
স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, নতুন ম্যানেজিং কমিটি কি এবারও আগের মতো দুই-চারজনের সিলেকশনে গঠিত হবে, নাকি বিদ্যালয়ের শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক নির্বাচন হবে?
ভুক্তভোগীর আহ্বান
ভুক্তভোগী পরিবার বলছে—
“স্বৈরাচারী এই দীর্ঘ শাসনামল মানুষকে ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। ০৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী ঘটনাগুলো প্রমাণ করে, কায়েমকোলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় এখন দলীয় প্রভাবের হাতে জিম্মি। আমরা শুধু ন্যায্য অধিকার চাই।”


