
নিউজ ডেস্ক :
লাথি, চড়, কিল-ঘুষি, গলাধাক্কা—এ যেন কোনো সন্ত্রাসীর নয়, একজন প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের চিত্র। যশোর সদর উপজেলার দত্তপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে মারধর, অসদাচরণ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করে আসছেন শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অন্তত ৬-৭ জন ব্যক্তি মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। একাধিক ঘটনায় তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়ে তিনি প্রশাসনিক শাস্তিও পেয়েছেন। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, এসবের পরও তার আচরণে কোনো পরিবর্তন আসেনি।
সর্বশেষ গত ১৮ মে বিদ্যালয়ের অভিভাবকদের উপস্থিতিতে এক সহকারী শিক্ষিকাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় বিদ্যালয়জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ভুক্তভোগী শিক্ষিকা ২০ মে সদর উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের অনুলিপি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, খুলনা বিভাগীয় উপপরিচালকের কার্যালয় এবং প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরেও পাঠানো হয়।
অভিযোগ দায়েরের এক মাসের বেশি সময় পার হলেও অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা শিক্ষা অফিস একটি তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, বারবার অভিযোগ ওঠার পরও কীভাবে পার পেয়ে যাচ্ছেন আব্দুল জব্বার?
ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৩ সালে যশোর জেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে প্রধান শিক্ষক আতিকুর রহমানকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। একই বছরে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসে প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমানকে অপদস্থ করার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
এছাড়া ২০২৩ সালে বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাতেমা তুজ জোহরাকে মারধরের অভিযোগে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। গুরুতর আহত ওই শিক্ষার্থীকে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর আগে ২০২২ সালে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অফিস সহকারী রেক্সোনাকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে তিনি রেক্সোনার চেয়ারে লাথি মারেন। পরে বিভাগীয় মামলার তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার দুটি ইনক্রিমেন্ট বন্ধ করে দেওয়া হয়।
শুধু আচরণগত নয়, তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। ২০২১ সালে বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর উপবৃত্তির টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ ছিল, শিক্ষার্থীর মায়ের নাম পরিবর্তন করে নিজের স্ত্রীর নাম যুক্ত করে উপবৃত্তির টাকা উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি সামনে এলে তদন্ত শুরু হয় এবং পরে তিনি টাকা ফেরত দেন বলে জানা যায়। এছাড়া বিদ্যালয়ের ক্ষুদ্র মেরামত ও স্লিপের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন আব্দুল জব্বার। সে সময় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তিনি বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্ব্যবহারের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করতেন। তার আচরণে ক্ষুব্ধ হলেও অনেকে ভয়ে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রধান শিক্ষক আব্দুল জব্বার। তিনি বলেন, “ওই শিক্ষিকা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন না। শিশুদের দাঁড়িয়ে ক্লাস নেওয়ার নির্দেশনাও মানেন না। এসব বিষয় নিয়ে কিছু কথা কাটাকাটি হয়েছে।”
শিক্ষিকার গায়ে হাত তোলার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আপনি কি দেখেছেন? আমিও সাংবাদিক ছিলাম। আপনি কিসের সাংবাদিক, সেটা দেখব।”
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে যশোর সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার হাবিবুর রহমানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
অভিযোগের পর অভিযোগ, তদন্তের পর তদন্ত এবং শাস্তির নজির থাকার পরও আব্দুল জব্বারের বিরুদ্ধে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না—এ প্রশ্ন এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
সূত্র : One news jessore


